স্টাফ রিপোর্ট।
দেশের আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও প্রযুক্তি-নির্ভর করে তুলতে বাংলাদেশ ব্যাংক ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই নতুন পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে দেশে সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক এবং শাখা বা উপশাখা বিহীন ব্যাংকিং সেবার সূচনা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্সের জন্য ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ১২৫ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী ১ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলো লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারবে।
কেমন হবে ডিজিটাল ব্যাংক:
শাখা বা অফিসবিহীন সেবা: ডিজিটাল ব্যাংকের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর কোনো শাখা বা উপশাখা থাকবে না। গ্রাহকেরা মোবাইল অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সব ধরনের ব্যাংকিং সেবা পাবেন। এর মানে, সশরীরে ব্যাংকে গিয়ে লাইনে দাঁড়ানোর প্রয়োজন নেই।
প্রযুক্তি-নির্ভরতা: এই ব্যাংক সম্পূর্ণভাবে প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। এর সব লেনদেন, অ্যাকাউন্ট খোলা, এবং অন্যান্য ব্যাংকিং কার্যক্রম অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পরিচালিত হবে।
অফিশিয়াল প্রধান কার্যালয়: যদিও কোনো শাখা থাকবে না, তবে ডিজিটাল ব্যাংকের পরিচালনার জন্য একটি প্রধান কার্যালয় থাকবে।
অন্যান্য ব্যাংকের অবকাঠামো ব্যবহার: গ্রাহকেরা তাঁদের ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা নেওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য প্রচলিত ব্যাংকের এটিএম, এজেন্ট এবং অন্যান্য পরিষেবা ব্যবহার করতে পারবেন।
সংক্ষেপে, এটি একটি সম্পূর্ণ ভার্চুয়াল ব্যাংক হবে, যা গ্রাহককে শাখা বা অফিসের ঝামেলা থেকে মুক্তি দিয়ে মোবাইল বা কম্পিউটারের মাধ্যমে সব ধরনের ব্যাংকিং সুবিধা দেবে।
নীতিমালার কঠোরতা ও প্রধান পরিবর্তন
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৩ সালের জুন মাসে ডিজিটাল ব্যাংকের জন্য একটি নীতিমালা প্রকাশ করেছিল। সেই নীতিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনে গতকাল মঙ্গলবার (২৭ আগস্ট) ‘ডিজিটাল ব্যাংক গাইডলাইন্স ২’ নামে একটি সংশোধিত সংস্করণ প্রকাশ করা হয়েছে। এই পরিবর্তনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো, ডিজিটাল ব্যাংকিং খাতে যেন কেবল যোগ্য এবং সুপ্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোই প্রবেশ করতে পারে।
সংশোধিত নীতিমালা অনুযায়ী, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকারী কোনো কোম্পানিকে নতুন হলে চলবে না। তাদের কমপক্ষে তিন বছরের চলমান ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা থাকতে হবে এবং পূর্ববর্তী তিন বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী জমা দিতে হবে। ন্যূনতম মূলধন লাগবে ৩০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া, দেশের কোনো প্রচলিত ব্যাংক কিংবা ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) এককভাবে ডিজিটাল ব্যাংকের উদ্যোক্তা হতে পারবে না। এর আগে বেসরকারি খাতের ১০টি ব্যাংকের একটি যৌথ আবেদন ছিল, যা নতুন এই শর্তের কারণে বাতিল করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিক এই বিষয়ে বলেন, ‘কোনো কোম্পানি খুলেই লাইসেন্স পাওয়া যাবে না। তিন বছরের চলমান ব্যবসার ওপর ভিত্তি করে মূল্যায়ন করা হবে।’
‘নগদ’-এর লাইসেন্স ও অন্যান্য আবেদন পুনর্বিবেচনা
মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ডাক বিভাগের ‘নগদ’কে দেওয়া ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, ‘নগদ’ পুনর্গঠনের পর যদি যোগ্য বিবেচিত হয়, তবে লাইসেন্স দেওয়া হবে। শুধু নগদ নয়, ডিজিটাল ব্যাংকের জন্য যেসব লাইসেন্স প্রক্রিয়াধীন ছিল, সেগুলোর বিষয়েও পুনর্বিবেচনা করা হবে। এর মাধ্যমে ডিজিটাল ব্যাংকিং কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
নেতৃত্ব ও প্রযুক্তিগত যোগ্যতার ওপর গুরুত্ব
সংশোধিত নীতিমালা অনুযায়ী, ডিজিটাল ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে নিয়োগ পেতে হলে প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যাংকিং এবং ফিনটেক পেশায় কমপক্ষে ৫ বছরের অভিজ্ঞতাসহ মোট ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। আগের নীতিমালায় ফিনটেক অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক ছিল না।
এ ছাড়া, ব্যাংকের পর্ষদের কমপক্ষে ৫০ শতাংশ সদস্যকে প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যাংকিং, সাইবার আইন এবং উদীয়মান প্রযুক্তি বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞানসম্পন্ন হতে হবে। অবশিষ্ট সদস্যরা ব্যাংকিং, ই-কমার্স, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ে অভিজ্ঞ হবেন। এই শর্তগুলো ডিজিটাল ব্যাংকের প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু পরিচালনা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে আনা হয়েছে।
ক্যাশলেস সোসাইটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর সম্প্রতি একটি সংলাপে জানান, প্রতি বছর কাগজের টাকা ছাপানো, পরিবহন ও ব্যবস্থাপনায় সরকারের প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়। এই বিশাল ব্যয় কমাতে এবং লেনদেনকে আরও দ্রুত ও নিরাপদ করতে ‘ক্যাশলেস সোসাইটি’ বা নগদবিহীন সমাজ গঠনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেন জনপ্রিয় করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিগত সহায়তা ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো তৈরি করছে। তিনি আরও বলেন, দেশের শতভাগ মানুষকে ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় আনতে হলে স্মার্টফোনের দাম কমাতে হবে এবং ইন্টারনেট সেবার মান বাড়াতে হবে।
সব মিলিয়ে, নতুন নীতিমালা ডিজিটাল ব্যাংকিংকে একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ এবং প্রযুক্তি-নির্ভর ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর চেষ্টা বলা যেতে পারে। এটি বাস্তবায়ন হলে দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় একটি নতুন যুগের সূচনা হবে বলে আশা করা যায়।